বাংলার যাত্রাপালা

বাংলার যাত্রা ॥ বাঁকে বাঁকে একুশ শতকে
মিলন কান্তি দে

বাংলাদেশে দেশজ সংস্কৃতি ধারার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে যাত্রার স্বীকৃতি আছে। নাট্যচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহাই যাত্রা।’ অধ্যাপক ও নাট্য গবেষক জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যাত্রাই আমাদের জাতীয় নাট্য’। শুরুতেই যাত্রাপালার যে কনসার্ট অর্থাৎ ঐকতানবাদন বেজে ওঠে, তার সুরে সুরে যেন আমরা অনুভব করি শস্য শ্যামল এই বাংলার বহুমাত্রিক সঙ্গীত সম্ভারের তাল-লয়-ছন্দের এক অপূর্ব সম্মিলন। ‘যাত্রা’ শব্দটি আবেগপ্রবণ বাঙালী মনকে আলোড়িত করে নিমিষেই এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে এর বহুবিধ ব্যবহার এ রকম : শোভাযাত্রা, স্নানযাত্রা, রথযাত্রা, মঙ্গল যাত্রা, যুদ্ধযাত্রা, বরযাত্রা, বিদেশ যাত্রা, শবযাত্রা, শুভযাত্রা- বহু রকমারি যাত্রা। আবার হাটে-বাজারে কিংবা নদীর পাড়ে কোন যাত্রাপ্যান্ডেল থেকে মাইকে ভেসে আসে কানফাটা আওয়াজ ‘যাত্রা-যাত্রা-যাত্রা’। সংস্কৃতির এই ধারাটি যুগের পর যুগ এসেছে ভিন্ন রূপে ভিন্ন সাজে।

উনিশ শতকের ষষ্ঠ ও সপ্তম দশকে শিক্ষিত ও শৌখিন সমাজে যাত্রার এক নতুন রূপান্তর ঘটে, যার নাম গীতাভিনয়। এই নতুন ধারার যাত্রাকে সমাজের বিশিষ্টজনদের কাছে সমাদৃত করে তোলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের গবেষণা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোরকালে কলকাতায় নতুন যাত্রার যুগ। বাংলায় একদা কৃষ্ণযাত্রা, রাসযাত্রা, রাই জন্মাদিনী যাত্রা ও বিদ্যাসুন্দর যাত্রার যে রূপ ছিল, তা পরিবর্তীত হয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পরিমার্জিত রূপে নতুন যাত্রার আত্মপ্রকাশ ঘটে। কবিগুরুর বাল্যকালে দেখা এমনি এক পালার নাম ‘নলদময়ন্তী।’

১৯৭২ সাল সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার বছর। এ বছরেই যাত্রাকে আধুনিক চিন্তা-চেতনায় উন্নীত করলেন ‘যাত্রাগুরু’ বলে খ্যাত বর্ধমানের ভার্ৎশালা গ্রামের মতিলাল রায় (১৮৩২-১৯০৮)। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশালের মাচরঙ্গের নট্ট কোম্পানি ইংরেজ শাসিত বাংলাদেশে প্রথম পেশাদারী যাত্রা সংগঠন। পশ্চিমবঙ্গে এ দলের সক্রিয় কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।

যাত্রাপালার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘বিবেক’। নাট্যতত্ত্বমীমাংসা গ্রন্থে ড. সাধন কুমার ভট্টাচার্যের উক্তি- ‘বিবেকই বাংলা যাত্রা নাটকের পতাকা চিহ্ন।’ ১৮৯৪ সালে পালাকার অহীভূষণ ভট্টাচার্য তার ‘সুরথ-উদ্ধার’ যাত্রাপালায় সর্বপ্রথম বিবেক সৃষ্টি করেন। ১২২ বছর আগে যাত্রাপালায় প্রথম বিবেকের গান—-

‘ওরে আপন বুঝে চল এই বেলা

ও যে বাস্তু শকুন উড়ছে মাথার গো

বসে যুক্তি দিচ্ছেন হাড়গেলা।’ —- (সংক্ষেপিত)

এভাবে বিভিন্ন পালাবদলের মধ্য দিয়ে রূপান্তর ঘটেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার।

স্বদেশী যাত্রা

বিশ শতকের সূচনায় পরাধীন জাতিকে মুক্তির গান শোনালেন নতুন যাত্রার নতুন যুবরাজ চারণ কবি মুকুন্দ দাশ (১৮৭৮-১৯৩৪)। তাঁর স্বদেশী যাত্রার বিস্ফোরণ ঘটল দেশজুড়ে। প্রেক্ষাপটটি ছিল এ রকম : ১৯০৫ সালের অক্টোবরে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ছিল এ দেশের মিলিত হিন্দু মুসলমানের সাম্য সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য ইংরেজ বেনিয়াদের এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। শুরু হলো দেশব্যাপী বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। এই সময় থেকে বাঙালীর মানসভূমে স্বদেশ চেতনা এক ভিন্নমাত্রায় রূপ নিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘আমার সোনার বাংলা’, রমেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী লিখলেন, ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা।’ পাশাপাশি মঞ্চায়ন হতে লাগল ‘পলাশীর পরে’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘রানাপ্রতাপ’ প্রভৃতি দেশপ্রেমমূলক নাটকগুলো। বঙ্গভঙ্গ আইনজারির ওই বছরেই (১৯০৫) আধুনিক রঙ্গমঞ্চের জনক গিরিশ ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে একটি উৎকৃষ্ট নাটক রচনা করেন। মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে ১৯০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সেই উত্তাল সময়ে জাতীয় জাগরণের এক সংগ্রামী নায়ক হিসেবে সিরাজকে মঞ্চে আনার গিরিশ ঘোষের এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে এ জন্য যে, বঙ্গভঙ্গ বিধানটি তো সরকারীভাবে ঘোষণা করা হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। তাহলে এর এক মাস আগে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু না হতেই জাতীয় চেতনা সৃষ্টিকারী নাটক লেখার প্রয়াস কেন? আসলে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়েছিল ১৯০৩ সালে বাংলার ছোট লাট এন্ডু ফ্রেজার আর ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব হার্বাট রিজলের প্রস্তাবেই। তখন থেকেই ইংরেজ শাসকচক্রের অশুভ পাঁয়তারার বিরুদ্ধে জনরোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। আর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকেই ঐতিহ্যবাহী যাত্রার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হলোÑ ‘স্বদেশী যাত্রা।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধের এই নতুন যাত্রার অধিকর্তা মুকুন্দদাশ গলা ছেড়ে গাইলেন :

‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম

তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি

অতলে জলে ডুবিয়ে দিতাম।’ (যাত্রাপালা মাতৃপূজা)

যাত্রাপালার প্রাণশক্তি যে কত প্রবল এবং এর ভাবরস মুহূর্তেই বিপরীত চিন্তার মানুষগুলোকে সুস্থ ভাবনায় ফিরিয়ে আনতে পারে, এমনই একটি ঘটনার অবতারণা হয়েছিল মুকুন্দ দাশের যাত্রাগানে। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘বাতায়ন’ নামে স্মৃতিচারণ গ্রন্থে আছে তারই উল্লেখ- ‘একবার ময়মনসিংহ শহরে মুকুন্দ দাশের দল আছে। তখন বাংলাময় মুকুন্দ দাশের নাম।… তখন আমার বাসায় ছিলেন নোয়াখালীর মৌলভী আহ্ছানউল।… বললাম, ‘মৌলভী সাহেব চলুন, গানটি শুনে আসি।’ যাত্রা শোনাকে যে আমি গুনাহ মনে করি।’ মৌলভী সাহেবের এ কথার উত্তরে আমি বললাম, ‘কিন্তু না দেখেশুনেই তো এতকাল রায় দিয়ে এসেছেন, আজ গিয়ে শুনুন, দরকার হয় কাল সকালে তওবা করে জোরেশোরে ফতোয়া দেবেন।’ মৌলভী সাহেব রাজি হলেন। গেলাম। মুকুন্দ দাশের বিরাট বপু। সেই বপু নিয়ে বুক ফুলয়ে দাঁড়িয়ে তার বিশাল বাহু দুলিয়ে আর অপূর্ব সুন্দর কণ্ঠে সুললিত ভাষায় যে অভিনয় করলেন, যে গান গাইলেন, প্রায় ২০ হাজার লোক রাত নয়টা হতে দুটো পর্যন্ত তা মুগ্ধ চিত্তে শুনল। কোথাও সুঁই পড়ার শব্দ হলো না। ফেরার পথে মৌলভী সাহেবকে বললাম, ‘তাহলে মৌলভী সাহেব, সকালে তো তওবা করতেই হবে।’ তওবা ! কি জন্য তওবা? ! ‘এই যে গান শুনলাম।’ মৌলভী সাহেব বললেন, ‘গান! এই জিনিসকে গান বলে কে?… মানুষকে সেবার জন্য, মানুষকে হক পথে পরিচালনার জন্য উনি যে সব কথা বললেন, সে যে সত্যিকারের ওয়াজ নসিহত।

মুকুন্দ দাশ সাতটি যাত্রাপালা রচনা করেছেন। তার যে পালাটি ইংরেজ সরকার প্রথম বাজেয়াফত করে এবং তাঁকে কারাদ- ভোগ করতে হয় তার নাম ‘মাতৃপূজা।’

পালা রচনার স্বর্ণযুগ

১৯১০ সালে যাত্রার নতুন পালাবদল। প্রথম ঐতিহাসিক পালা রচনা- ‘পদ্মিণী।’ দিল্লীর বাদশাহ্ আলাউদ্দিন খিলজীর অতর্কিতে চিতোর আক্রমণ এবং রাজপুত রানা ভীমসিংহের অপরূপা স্ত্রীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা- এই আখ্যান অবলম্বনে রচিত হয়েছে পদ্মিণী পালা। এই কৃতিত্ব পালাকার হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭১-১৯২৬)। যাত্রায় ব্যালে নৃত্যের প্রচলন এই পালা থেকে। পরবর্তীতে ব্যালের নতুন নাম হয় ‘ব্যালট।’ ১২টি মেয়ের অংশগ্রহণে ব্যালট তৈরি হয় এবং তারা সম্রাট-বেগম, রাজা-রানী কিংবা যে কোন উল্লেখযোগ্য চরিত্রের তাৎক্ষণিক মানসিক প্রতিক্রিয়া নৃত্যগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করে। ‘সোহরাব-রুস্তম’ যাত্রাপালায় সূচনা দৃশ্যে সন্তানসম্ভবা তাহ্মিনা যখন পরম করুণাময়ের দোয়া কামনা করছেন, সেই সময় ব্যালটের মেয়েরা ত্বরিতগতিতে মঞ্চে এসে হেসে খেলে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে এভাবে :

‘ভাবনা কি আর সই

ঘরের কাছে এসে গেছে স্বর্গে ওঠার মই।’

গত এক শ’ বছরের যাত্রাশিল্পের ক্রমবিকাশ এবং এর উন্নয়ন উৎকর্ষের মূলে রয়েছে শিক্ষিত, সমকালীন সচেতনতাবোধ ও জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন যাত্রাপালাকারদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রয়াস। বাঙালীর অন্যতম আদি সংস্কৃতি যাত্রার প্রতি এক শ্রেণী শিক্ষিত বাঙালীরই মজ্জাগত অনীহা রয়েছে। এই হীনম্মন্যতা সেকালেও ছিল, একালেও আছে। উন্নাসিক ও শ্লেষাত্মক মনোভাব নিয়ে তারা ‘যাত্রা’ শব্দটি উচ্চারণ করে থাকেন। এ শ্রেণীর শিক্ষিতদের বিশ্বাস, যাত্রা যারা করে কিংবা লেখে তারা সমাজের অপাঙ্ক্তেয়, স্কুল কলেজের চৌকাঠ মাড়ায়নি। যাত্রার ধারাবাহিক ইতিহাস জানা থাকলে এ রকম অমূলক ধারণার সৃষ্টি হতো না। প্রথম ঐতিহাসিক পালার রচয়িতা হাওড়া জেলার কল্যাণপুরের হরিপদ চট্টোপাধ্যায় (১৮৭১-১৯২০) হুগলি নর্মাল স্কুলের এবং কলকাতা সংস্কৃত কলেজের ছাত্র ছিলেন। তাঁর পালা রচনার বিশেষত্ব এই যে, পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক যে কাহিনীই হোক রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে স্বদেশ চেতনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। এ কারণে ইংরেজ সরকার হরিপদ’র তিনখানা পালা ‘পদ্মিণী’, ‘রণজিৎ রাজার জীবন যজ্ঞ’ ও ‘দুর্গাসুর’ বাজেয়াফত করেছিল। যাত্রাপালাকার অঘোর চন্দ্র ভট্টাচার্য (১৮৭২-১৯৪৩) ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। ভাষা ও ব্যাকরণে অগাধ পা-িত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘কাব্যতীর্থ’ উপাধি পান। বাংলাদেশে নড়াইল জেলার মল্লিকপুরে তার জন্ম। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পালা : ‘মগধ বিজয়’, ‘দাতা কর্ণ’, ‘সমুদ্র মন্থন’, ‘হরিশচন্দ্র’ ও ‘অনন্ত মাহাত্ম্য।’ অনন্তমাহাত্ম্য যাত্রাপালায় অভিনয় করেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নারী চরিত্রের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী নগেন নন্দী (১৯০৩-১৯৮৪)। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *