রাজনীতির ডান-বাম

0
110

রাজনীতির ডান-বাম

Shamim Ahsan

ডানপন্থা এবং বামপন্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল এবং জোট সারাবিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশেও প্রচলিত। দেখা যায় আমরা একে অন্যকে অকপটে ডানপন্থী বা বামপন্থী হিসেবেও চিহ্নিত করে থাকি। কিন্তু এভাবে চিহ্নিত করাটা কতটুকু সঠিক এবং যৌক্তিক?
সেসব বিচার করতে হলে আমাদেরকে ফিরে তাকাতে হবে বিশ্ব রাজনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও মতবাদের দিকে।

আমাদের প্রথমেই যেতে হবে অাঠারো শতকের ফ্রান্সে,যেখানে ঘটে গেছে এক বড়সড় বিপ্লব “ফরাসি বিপ্লব”। তো নতুন ফরাসি রিপাবলিকে
সংবিধানের খসড়া তৈরির জন্য গঠিত হলো National Constituent Assembly।যেহেতু প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবার পরও জনগণের কিংবা জনপ্রতিনিধিদের এক বিশাল অংশ রাজাকে সমর্থন করতো।তাই এই সংবিধানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিলো যে এটি “তৎকালীন রাজাকে Veto দেবার পুর্নাঙ্গ ক্ষমতা দেবে কি না?”

তো ভোট গ্রহনের সুবিধার্থে,যেসব প্রতিনিধি এই প্রস্তাবে রাজাকে সমর্থন করে তাদেরকে বলা হলো স্পিকারের ডানদিকে বসার জন্য এবং যারা রাজাকে অসমর্থন করে তাদেরকে বলা হলো স্পিকারের বামদিকে বসার জন্য। আর ঠিক এভাবেই প্রথার পক্ষে থেকে কনজার্ভেটিভ ও পরিবর্তনের পক্ষে থেকে লিবারেল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ভোট
দেয়ার মধ্য দিয়ে উৎপত্তি ঘটলো বিশ্ববিস্তৃত ডান ও বাম ধারণার। এরপর থেকে এসেম্বলিতে ডেপুটিগন ভোটের দিনের মত করেই ডানে ও বামে
আলাদা আলাদা বসতে লাগলেন।
এর কারণটাও Baron de Guaville ব্যাখ্যা করলেন ঠিক এভাবে, “We began to recognize each other; those who were loyal to religion and the King took up positions to the right of the chair so as to avoid the shouts,oaths,and indecencies that enjoyed free reign in the opposing camp.”

যদিও এ ঘটনা যে সময়কার, ঠিক সে সময়ে বাম ডান সমীকরণটি ছিলো
একান্তই ফ্রান্সের অভ্যন্তরীন,তাহলে এটি বৈশ্বিক ধারণায় পা রাখলো কখন,কিভাবে?
আসলে ফ্রান্সের মতই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব যখন অন্যান্য অঞ্চলে দেখা দিলো,ঠিক তখনই প্রচলিত সরকার ব্যবস্থায় আস্থাশীলদের এবং পরিবর্তনে আস্থাশীলদের আলাদা আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে তৎকালীন
বিশ্লেষকরা এই বামপন্থী এবং ডানপন্থী টার্ম ব্যবহার করলেন। আর এসব বিশ্লেষণের দরকার পড়লো ফরাসী বিপ্লবের প্রায় আরও একশো বছর পর।কারণ,ঠিক সে সময়টাতেই বিশ্বব্যাপী Revolution গুলো একের পর এক সামনে আসতে থাকে। ১৯২০ এর দিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বই-পুস্তক,পত্র-পত্রিকায় এদের ব্যবহার জোরেশোরে চলতে আরম্ভ করে,আমেরিকা এই ধারণার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে Civil rights movement এর সময় তথা ১৯৬০ এর দিকে। এরপর ধীরে ধীরে এই ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,বিশ্বের সব অঞ্চলে তো বিপ্লব ঠিক একই দাবী দাওয়া নিয়ে বা একই সমস্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। তাহলে সবাইকে ঠিক
বামের কাতারে কিংবা ডানের কাতারে কিভাবে ফেলবেন?

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া যেকোনো একটা মতবাদ কিছু সাধারণ আদর্শকে
সামনে রেখে নিজেদের পরিচালিত করে। আর এসবের ওপর ভিত্তি করেই বামপন্থা এবং ডানপন্থা কে আলাদা করা যায়।

বামপন্থার রাজনীতি দাবী করে,রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে
Liberty,equality,progress,internationalism এর উপর ভিত্তি করে। যার ফলে বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা,সমলিঙ্গ বিবাহ,উন্মুক্ত বা সহজ অভিবাসন,ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ, ইত্যাদি নীতিকে সমর্থন করে।বামপন্থা বিশ্বাস করে, মানুষের জীবনে সরকারের অধিক সম্পৃক্ততাই সামাজিক জীবনকে উন্নত করতে সক্ষম।

অন্যদিকে ডানপন্থার রাজনীতি প্রাধান্য দেয় প্রচলিত ব্যবস্থা বা Authority,Hierarchy,Tradition,Nationalism কে। এজন্য দেখা যায়
প্রধান বা এক ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা,কঠিন অভিবাসন নীতি,লঘু করারোপ,স্বাধীন গর্ভপাত বিরোধিতা,ইত্যাদিকে ডানপন্থা সমর্থন করে থাকে। ডানপন্থা দাবী করে সরকারী হস্তক্ষেপ যত কম, সামাজিক উন্নতি তত বেশি।

এবার নিজেই ঠিক করুন কাকে সমর্থন করবেন? ডানপন্থী না বামপন্থী?
নাকি এদের বাইরের কেউ?