বৈদ্যব্রাহ্মণ

0
230

বৈদ্যব্রাহ্মণ

বৈদ্য(Sanskritवैद्य Bengaliবৈদ্য Malayalam:വാദ്ധ്യാർ) এবং বেদ একই শব্দমূল বিদ ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ জ্ঞান, মূলত বৈদিক ব্রাহ্মণদের যে শাখা আধ্যাত্মিক ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্র তথা উপবেদ ” আয়ুর্বেদ” অনুশীলন করতেন সেই সম্প্রদায়ের বেদজ্ঞানীগণ বৈদ্য ব্রাহ্মণ[১] হিসেবে পরিচত।
ঋকবেদ(১০।৯৭।৬) অনুসারে  সেই ব্রাহ্মণই(বিপ্র)  বৈদ্য যিনি ব্যাধিকে দুরীভূত করেন ও বিনাশ করেন, যাঁহার মস্তিষ্কে ওষধীর তত্ত্বজ্ঞান সমিতিতে রাজা ও পরিষদের ন্যায় দোদীপ্যমান থাকে।
যজুর্বেদ(১৯।১২) এ বৈদ্যকে বলা হয়েছে “আত্মার কল্যাণের জন্য ইন্দ্রিয়ের দমনকর্তা” এবং দেবতুল্য বিশেষায়িত করা হয়েছে “বৈদ্য নিজের শক্তিতে চিকিৎসার বিস্তার করেন” উক্তিটি দ্বারা।   
ব্রহ্মান্ড পুরাণ অনুসারে দ্বিজত্ত প্রাপ্তির পর যাঁরা চৌদ্দ শাস্ত্র অধ্যয়নে ব্রতী হতেন এবং পুনরায় উপনীত হয়ে বেদের উপবেদ রূপে আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন করতেন তাঁদের বৈদ্যব্রাহ্মণ বা ত্রিজ নামে অবিহিত করা হত।[২]মহাভারতের উদ্যোগপর্বে বলা হয়েছে, ‘‘ প্রাণী অপ্রাণীর মধ্যে প্রাণীরা শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিমানরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদিগের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ, মানুষদিগের মধ্যে ব্রাহ্মণরা শ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণগণের মধ্যে বৈদ্যরা শ্রেষ্ঠ, বৈদ্যগণের মধ্যে যাদের বুদ্ধি পরিণত হয়ে সাধনার অভিমুখে চালিত হয়েছে, তাঁরা শ্রেষ্ঠ। ’’
মহাভারতে দ্রুপদ কর্তৃক মনুর বচন  “দ্বিজেষু বৈদ্যাঃ শ্রেয়াংসঃ’’—  অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণই বৈদ্য।
ফণিভূষণ আচার্যের ‘শব্দসন্ধান’-এ বৈদ্যের ব্যাখ্যা, ‘‘যিনি সর্ববিদ্যায় পারদর্শী: বৈদ্য, যিনি সকল বেদে দক্ষ: বৈদ্য এবং যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে কুশল: বৈদ্য।’’ হিন্দু গ্রন্থ পরাশর সংহিতা অনুসারে বিখ্যাত লেখক লেসলি বর্ণনা করেছেন যে বৈদ্যরা কেবলমাত্র ব্রাহ্মণদেরই চিকিৎসা করত আর সেই কারণেই দ্বীজের মধ্যে ব্রহ্মের নিখুঁত / সুবিন্যস্ত গোষ্ঠী বৈদ্যব্রাহ্মণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বৈদ্য ছাড়া বাকিরা (অশুচি) অম্বষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়।[৩] ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের বর্ণনানুসারে দেবচিকিৎসক অশ্বিনীকুমারের ব্রাহ্মণী স্ত্রীর সন্তানরা বৈদ্যব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণ পিতা ও বৈশ্যমাতার সন্তানরা অম্বষ্ঠ।

সমুদ্রমন্থনে ধন্বন্তরির জন্ম

প্রচলিত একটি মতে দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনকালে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় এবং বৈদ্যরা তার উত্তরপুরুষ। অন্য মতে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় জনৈক মুনির বৈদিক মন্ত্র জপের মাধ্যমে তাই তিনি বৈদ্য নামে পরিচিত হন। মনুস্মৃতিতে বৈদ্যব্রাহ্মণ পিতা ও বৈশ্য মাতার অনুলোম সংকর জাতি হিসেবে অম্বষ্ঠদের উল্লেখ করা হয়েছে। “ব্রাহ্মণ্যবৈদ্যবৈশ্যকন্যায়াং অম্বষ্ঠ নাম জায়তে…”। (মনুস্মৃতি ১০. ৪৭ ও ৮) বৈদ্য ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি মতও প্রচলিত আছে যে, অম্বষ্ঠ নামে সিন্ধুনদের তীরে একটি স্থান ছিল; সেখান থেকে বৈদ্যদের একটি দল দক্ষিণ ভারতে এবং অন্য একটি দল বাংলায় আসে।বৈদ্যরা সাধরণত আয়ুর্বেদ পঠন-পাঠন ও ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন দ্বিজের চিকিৎসা করত অপরদিকে অম্বষ্ঠ নিম্নজাতের ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, শুদ্রের চিকিৎসা করত। [৪]

বৈদ্যব্রাহ্মণ পদবী

  • সেন : সেনগুপ্ত, সেনশর্মা,সেন চৌধুরী,   সেন লাল

  • গুপ্ত: সেনগুপ্ত, দাশগুপ্ত,  দত্তগুপ্ত, গুপ্তশর্মা, ধরগুপ্ত, করগুপ্ত।

  • শর্মা : সেনশর্মা, গুপ্তশর্মা, দাশশর্মা, ধরশর্মা , করশর্মা, দেবশর্মা

  • আচার্য : সেন আচার্য,  গুপ্ত আচার্য

  • মল্লিক

  • মজুমদার

পেশাদারী ইতিহাস

প্রাচীণকালে সকল শ্রেণীর ব্রাহ্মণ বৈদ্য হতে পারত।কালক্রমে পেশাগত কারণে বৈদ্যদের একটি স্বতন্ত্র সমাজ গড়ে ওঠে এবং নিজেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ,অথর্ববেদ ছাড়াও অষ্টবৈদ্য,বৈদ্যক গুপ্তবিদ্যা বা স্বতন্ত্র দক্ষতাসম্পন্ন চিকিৎসাবিদ্যার প্রসার লাভ করে এবং বংশানুক্রমিক আলাদা একটি সম্প্রদায়ের সূচনা হয়।এ কারণে অন্য পেশার ব্রাহ্মণরা চাইলেও আর বৈদ্যদের সমকক্ষ পেশাদারী হতে পারত না।প্রাচীণ ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈদ্যদের উপর নির্ভরশীল ছিল।প্রবীণ অনুশীলনকারী বা শিক্ষকদের সম্মানের চিহ্ন হিসাবে বৈদ্যরাজ (“চিকিৎসক-রাজা”) বলা হত। কিছু অনুশীলনকারী যাদের গ্রন্থগুলির সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল এবং অনুশীলনে দক্ষ ছিলেন তারা প্রানাচার্য নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতের কিছু রাজপরিবারের ব্যক্তিগত বৈদ্য ছিল এবং তাদের রাজবৈদ্য (“রাজার চিকিত্সক”) হিসাবে উল্লেখ করা হত।মুসলিম শাসনামলে ইউনানী, ইংরেজ উপনিবেশিক কালে হোমোপ্যাথিক এবং অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আবির্ভাব হলে বৈদ্যব্রাহ্মণ শ্রেণির প্রভাব কমে যায় এবং বৈদ্যদেরকে প্রচুর পরিমাণে নিজ পেশা পরিবর্তন করে অন্যান্য আধুনিক পেশায় নিয়োজিত হতে দেখা যায়।

শ্রেণি বিভাগ

প্রাচীনকালে যেহেতু সকল শ্রেণীর ব্রাহ্মণ বৈদ্য হতে পারত তাই বৈদ্যদের মাঝে শ্রেনীবিভাগও অনেক কিন্তু সকলে মিলে “বৈদ্যব্রাহ্মণ” নামে একটি সম্প্রদায়ে সমবেত হয়।[৫] কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈদ্যব্রাহ্মণ শ্রেণি:

  • সারস্বত বৈদ্যব্রাহ্মণ:পুরো ভারতবর্ষে এই সারস্বত বৈদ্য শ্রেণি বিদ্যমান। [৬]
  • গৌড় সারস্বত বৈদ্যব্রাহ্মণ: বাংলাদেশ,পশ্চিমবঙ্গ,কর্ণাটক,কেরালায় সাধারণত এই শ্রেণি দেখা যায়।[৭]
  • পাঞ্জাবি সারস্বত বৈদ্যব্রাহ্মণ: পাঞ্জাবে স্বারস্বত ব্রাহ্মণদের মাঝে এই বৈদ্যশ্রেণি বিদ্যমান।এরা ময়হাল ব্রাহ্মণ হিসেবেও পরিচিত। [৮]
  • রাঢ়ী বৈদ্যব্রাহ্মণ:বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়।[৯]
  • বরেন্দ্র বৈদ্যব্রাহ্মণ: বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়।[১০]
  • পুষ্পক বৈদ্যব্রাহ্মণ: কেরালায় এ বৈদ্যব্রাহ্মণ শ্রেনি অষ্টবৈদ্য নামে পরিচিত।[১১][১২][১৩]
  • উৎকল বৈদ্যব্রাহ্মণ: এদের আদি নিবাস উড়িষ্যায় হলেও বাঙলায়ও এই বৈদ্যব্রাহ্মণ দেখা যায়।

বৈদ্যদের পূজাঅর্চনা

রাজ্যলাভ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কর্মে সাফল্য লাভের জন্য রাজসূয়, বাজপেয়, অশ্বমেধ ইত্যাদি যাগযজ্ঞ পালন করত এবং ঋত্বিক এর ভূমিকা পালন করত । বৈদ্যরা “৩৩ দেব”- এর পূজা করে ত্রিলোকের একাদশ দেবতা বা দ্বাদশ আদিত্য,একাদশ রুদ্র,অষ্টবসু এবং বেদের ব্রাহ্মণ অংশে অশ্বিনীকুমারদ্বয়[৭][১৫]

In English:

In the Vedic age, Brahmins who were proficient in all Vedas were given the title of Vaidya. The words “Vaidya” and “Veda” comes from the same root Vida(Sanskrit:बीड), which means “Knowledge”.Vaidya means “Doctor” or “Specialist”.Vaidya are practitioners of Ayurveda(Part of Rigveda) and Atharbaveda. According to the Rigveda (10|97|6), the Brahman (Bipra) who removes and destroys the disease is “Vaidya”.[1] According to ” Udjog Parba” of Mahabharata, “Animals are the best of non-living beings, intelligent beings are the best of animals, human beings are the best of intelligent beings, Brahmins are the best of human beings, Vaidyas are the best of Brahmins.” “Dvijeshu Vaidya Shreyangsah”(Vaidya is best among twiceborn/diborn) – Manu’s words by Drupada in the Mahabharata.Maharshi Shankha says, “Bedojjato hi vaidya: sat”, meaning the origin of vaidya from the Vedas. In the Vedic age, after studying four Vedas and becoming proficient in Ayurveda, Brahmins got the title of Vaidya. Ayurveda is a part of Veda, Ayurveda has been called Rigveda Subveda: “Rigvedasya Ayurveda Upveda”. In the Vedic age, only Brahmins could become doctors by becoming experts in Ayurveda, so the Vaidyas were called Trijas. That is to say, the second birth of a Brahmin child, after Upanayan and later after becoming proficient in Ayurveda, the third birth took place – “Vaidyastrijah Smritah” (Maharshi Charak). There is a lot of evidence in Rigveda and Yajurveda – ‘Vaidya’, the best Brahmin due to knowledge. It has been said in Sion’s commentary that a Brahmin with medical knowledge is a Vaidya. Vaidya’s explanation in Acharya’s ‘Shabdasandhan’, who is omniscient Daya Pardarshi: Vaidya, who is proficient in all Vedas: Vaidya and who is skilled in medicine: Vaidya. In the Vedic age, no one except Brahmins had the right to recite Vedas.

Root classes of vaidya

In ancient times, since all classes of Brahmins could be Vaidyas, there were many divisions among the Vaidyas, but all of them came together in a community called “Vaidyabrahman”.Shakdipi brahmin:Almost all the members of this Brahmin community are practicing “Ayurveda” they are vaidya.

Puspaka brahmin: A puspaka brahmin community of kerala practices ”Astha Vaidya” tradition.

Punjabi Saraswat brahman: This community is found at punjab.They known as Vaid.[2]

Saraswat Brahman: This Saraswat Vaidya class exists all over India.

Gaur Saraswat brahman: This class is commonly found in Bangladesh, West Bengal, Karnataka, Kerala.

Radhi brahman: Seen in Bangladesh and West Bengal.

Varendra brahman: Seen in Bangladesh and West Bengal.

Utkal brahmin: The Vaidya group is found among Utkal brahmin of Odisha and bengal.

তথ্যসূত্র

  1.  সেনশর্মা, ত্রিভঙ্গমোহন (১০ মার্চ ২০১১)। “কুলদর্পণ”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  2.  Brahmanda-Puranam: inspired, inwardly stirred, wise, learned, etc.
  3.  Leslie, Charles M. (১৯৭৬)। Asian Medical Systems: A Comparative Study। University of California Press। পৃষ্ঠা 37। আইএসবিএন 978-0-52003-511-9
  4.  “উৎপত্তি”
  5.  সেনশর্মা, ত্রিভঙ্গমোহন (১০ মার্চ ২০১১)। “বৈদ্যব্রাহ্মণ কুলপঞ্জিকা”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  6.  সেনশর্মা, ত্রিভঙ্গমোহন (১০ মার্চ ২০১১)। “বৈদ্যব্রাহ্মণ কুলপঞ্জিকা”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  7.  সেনশর্মা, ত্রিভঙ্গমোহন (১০ মার্চ ২০১১)। “বৈদ্যব্রাহ্মণ কুলপঞ্জিকা”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  8.  Dutta, Anil (১০ মার্চ ২০১১)। “Vaidya as Punjabi Saraswat Brahmin”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  9.  সেনশর্মা, ত্রিভঙ্গমোহন (১০ মার্চ ২০১১)। “বৈদ্যব্রাহ্মণ কুলপঞ্জিকা”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  10.  সেনশর্মা, ত্রিভঙ্গমোহন (১০ মার্চ ২০১১)। “বৈদ্যব্রাহ্মণ কুলপঞ্জিকা”। Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  11.  Indudharan Menon, Annamma Spudich (অক্টোবর ২০১০)। “The Ashtavaidya physicians of Kerala: A tradition in transition”। Journal of Ayurveda and Integrative Medicine। 1 (4): 245–50। doi:10.4103/0975-9476.74424। PMID 21731370। পিএমসি 3117315অবাধে প্রবেশযোগ্য। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৬
  12.  V. T. Yadugiri (২৫ আগস্ট ২০১০)। “The Ashtavaidya medical tradition of Kerala” (PDF)। Current Science। 99 (4)। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৬
  13.  P. U. Leela (জানুয়ারি ২০১৩)। “Healers in the context of culture: The ashtavaidya tradition of Kerala, South India.”। Ancient Science of Life। 32 (S9): S9। doi:10.4103/0257-7941.123821। পিএমসি 4147565