ধারাবাহীক উপন্যাস
(পর্ব এক)

আমি একা ও কয়েকজন
আসিফ আহমদ

দরজা শব্দ হচ্ছে, ধুম ,ধুম ,ধুম….।

গোটা ঘর সিগেরেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ফ্যানের বাতাসে যেন ধোঁয়া গুলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে,তার সাথে দুলে উঠছে, দড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপড় গুলো। এক কোণায় শুয়ে থাকা রাকিব নাক ডেকে চলছে অনরগল।

আবার দরজায় শব্দ হচ্ছে, ধুম, ধুম, ধুম..

এবারের শব্দটা আগের তুলনায় বিকট।

বাছির আমার দিকে অনেকটা ভীতু নয়নে তাকিয়ে ইঙ্গিত করল, দরজাটা খুলতে। আমি না সূচক মাথা নাড়ালাম দু, দিকে।

পাশ থেকে তালহা ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠলো, দরজা খুল হারাম জাদা।

আমি অবাক হওয়া ভঙ্গিতে বললাম, তোর মাথা ঠিক আছে! বাড়িওয়ালা এসেছে কি বলবি? তালহা এবার কিছুটা চাপা স্বরে বলল, সেটা আমি বুঝব।

সিগেরেটটা নিভিয়ে ধীরলয়ে পা বাড়ালাম দরজার দিকে, কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা খুলতেই চোখে পরলো, ইকবাল সাহেবের কাচা পাকা দাড়ি ভরতি কুৎসিত মুখ খানা। দু, আঙ্গুলের মধ্যে খানে আধ পোড়া সিগেরেট, একটি সুখ টান দিয়েই ছুড়ে মারলো এক কোণায়। কালচে ধোঁয়া গুলো ছাড়লো আমার দিকে।

সজোরে কেশ্বে উঠলাম, ধোঁয়া আমার নাকে যেতেই। এর মধ্যে তালহা এসে উপস্থিত, কিছুটা হাসি হাসি মুখ করে মৃদু স্বরে সালাম দিল, আস্সালামু আলাইকুম আংকেল। ইকবাল সাহেব সালামের উওর নাদিয়েই আলতো সরিয়ে আমাদের, ঢুকে পরলো ভেতরে।

ইতিউতি চোখ বুলিয়ে পকেট থেকে সিগেরেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগেরেট মুখে দিল, কিছুটা বিরক্ত হাওয়ার ভঙ্গি করে বলল, লাইটার গাঁ ঘরত রেখে আসছি ফানলার!

তোমাদের লাইটার গাঁ, এক্কানা দঁ, সাই… বালিশের নিচ থেকে লাইটারটা বের করে দিল, বাছির। অনেকটা নায়কের স্টাইলে সিগেরেট ধরিয়ে লাইটারটা ছুড়ে মারলো বাছিরের দিকে। সিগেরেট ফুঁকতে ফুঁকতে আবার ইতিউতি চোখ বলুয়ে নিলো বিচক্ষন দৃষ্টিতে।

উনার এসব কান্ড দেখে আমি কেন যেন বেশ মজা পাচ্ছি। অথচো এতক্ষণে ভয়ে আমার গোটা শরীর থর থরে কাঁপার কথা, সেই জায়গায় কিনা আমি মজা পাচ্ছি! এই ভেবেই আমার হাসি পেল….

ইকবাল সাহেবের কড়া নিয়ম প্রতি মাসের ভাড়া দু-হতে পাঁচ তারিখের মধ্যে প্ররিশোধ করতে হবে নইলে সোজা ঘর খালি করতে হবে।

সেখানে আমাদের পাঁচ তারিখের জায়গায় পঁচিশ তারিখ অব্ধি গড়ায়, সেজন্য অবশ্য আমাদের কম ঝামেলা পোহাতে হয়না। প্রতি মাসে শুনতে হয় চাটগাঁইয়া ও শুদ্ধ ভাষা মিশ্রিত হরেক রকম খিস্তি, যদিও আমি চট্টগ্রামের ভাষা বেশি একটা বুঝিনা আর সকলে বুঝে বেশ ভাল বলতেও পারে।

এই মাসের ভাড়াটা এখনো দেওয়া হয়নি পঁচিশ তারিখ পেরিয়ে তিরিশের কোঠায়, এমনটা আজ অব্ধি কখনো হয়নি আমাদের। অপদার্থ হলেও কিছুটা পদার্থও আছে। সদা বিশ হতে পঁচিশ তারিখের মধ্যে টাকা পেইড করেদি আর তা
যেভাবেই হোকনা কেন।

ইকবাল সাহেব কিছুটা চেচিয়ে বলল, ক্যাঁন হইছে তোমাদের, টিয়াকা নঁ, দও, আজকে কয় তারিখ মনত আছে?

তালহা মেঝের দিকে তাকিয়ে কিছুটা নিচু স্বরে বলল, ২৯ তারিখ আংকেল।

— তইলে টিয়া কিল্লাই দিচ্ছনা, টিয়া দেও।

তালহা এবার কিছুটা কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, আংকেল টাকা এখনো জোগাড় হয়নি একটু সময় লাগবে।

— সময় লাগবে মানে কি তোমরা আরে পঁল পাইছো?

— না আংকেল।

— তাহলে?

— আংকেল একটু বুঝার চেষ্টা করুন, সবার টাকা এখনো জোগাড় হয়নি।

— কয় জনের টিয়া জোগাড় হইয়ে?

— দুই জনের।

— ঐ দুই জনের টিয়া গুলা দেও।

তালহা আমাদের নিয়ে একটা প্রতিজ্ঞা। করেছিল, যতদিন না সকলের টাকা জোগাড় হচ্ছে ততদিন অব্ধি কেউ ভাড়া দেবনা। সকলের টাকা জোগাড় হলে তবেই এক সাথে ভাড়া দেব, এর আগে নয়। তার জন্য যদি গালি শুনতে হয় তাহলে তাই শুনব, বন্ধু হয়ে বন্ধুর জন্য দুটো গালি শুনতে পারব না, তাহলে আবার কিসের বন্ধু? বন্ধু মানে কি শুধু সুখের সময় গিয়ে সেলিব্রেট করা আর দুঃখের সময় মুখ লুকিয়ে পালিয়ে বেড়ানো? বন্ধু তো সেই যে সুখে দুঃখে সদা পাশে থাকবে।

কেউ কেউ অবশ্য একথা মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি হল, যার টাকা জোগোড় হবে সে গিয়ে বাড়িওয়ালা কে দিয়ে আসবে। অযাথা অন্যের কুকির্তীর জন্য নিজে কেন দায়ী হতে যাব?

অনিচ্ছা সত্বেও পকেট থেকে দুটো একহাজার টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দিল ইকবাল সাহেবের দিকে,যেন নোট দুটো উনার জন্যই গুচ্ছিতো ছিল।

তালহার ভেতরটা কেমন গুঙিয়ে মোচড়ে উঠলো,হৃদপিন্ডটা যেন এখনি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। নিজেকে মনে হচ্ছে এক বিরাট অপরাধী। মনে মেনে বলে উঠলো,কি দরকার ছিল টাকা গুলোর কথা বলার? এখন যে আমি নিজেই নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলাম। সবাই তো ভাববে আমি প্রতারক। বলবে,সালা নিজে সবাই কে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিজেই ভাঙলো! সাব্বাস ব্যাটা, সাব্বাস।

হেঁচকা টান দিয়ে নোট দুটো হাতে নিলো ইকবাল সাহেব, আরেকটু হলেই ছেঁড়ার উপক্রম। পুনরায় একটি সুখ টান দিয়ে ধোঁয়া ছুড়লো আমার নাক বরাবর। আমি সরে দাড়ালাম এক পাশে।

বুঝতে পারলাম শুরু হতে যাচ্ছে ইকবাল সাহেবের চাঁটগাইয়া ও শুদ্ধ ভাষা মিশ্রিত শ্রুতিমধুর ভাষণ, তাই একটু নড়েচড়ে দাঁড়ালাম।

তোমরা যদি প্রতি মাসে এইল্লা করো তইলে গম, লায়না? পাঁচ তারিখের মধ্যে এই মাস সহ আগামী মাসের টিয়া গুন দি ফালাইয়ো ঠিক আছে? আমি তোমাদেরকে আঁর পোয়ার ডইক্কা মহাব্বত করি তঁও যদি তোমরা না বুঝো তইলে আই কিত্তাম বলো চাই? আর তোমাদেরাকে আই খঁইয়েদি ননে – ঘরগা এক্কানা সুন্দর করে গোছাই রাহিবাল্লাই। দেখতে খন্ডইল্লা গোয়াল ঘরের মত লাগের।

তোমাদের কে বলে আর ফায়দা কি যদি কথা নঁ,ফুনো।অনেকটা ব্যর্থ পিতার ছাপ ভেসে উঠলো ইকবাল সাহেবের মুখ জুড়ে,যেন আমাদের সুধ্রাতে না পেরে হতাশ তিনি। মৃদ স্বরে বলল,তইলে আমি যাইয়ের ভাড়া গুন ঠিক মত দি, ফালাইয়ো।

কথা গুলো শেষ করে দরজার দিকে পা বাড়লো ইকবাল সাহেব, চটি জোড়া পায়ে দিয়ে মুহূর্তে কোথায় যেন হারিয়ে গেল আবছা অন্ধকারের মাঝে। অনেকটা চাতক পাখির ন্যয় উদ্দীপনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আমরা, উনার পথচারীত পথের দিকে আনমনে।